জলবায়ু পরিবর্তন এবং নতুন ভাবনা
- August 12,2021
- 392 views
জলবায়ু পরিবর্তন এবং নতুন ভাবনা নিয়ে লিখেছেনঃ
মোঃ মোশারফ হোসাইন
সহকারী কমিশনার (ভূমি)
নবীনগর ,ব্রাহ্মণবাড়িয়া
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ হচ্ছে কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2) । এটি একটি প্রাকৃতিক রাসায়নিক যৌগ, যা দুইটি অক্সিজেন পরমাণু ও একটি কার্বন পরমাণু দিয়ে গঠিত। এতে প্রতিটি অক্সিজেন পরমাণু একটি কার্বন পরমাণুর সাথে দ্বি-বন্ধন দ্বারা যুক্ত থাকে। গ্রিন-হাউজ গ্যাস নামে পরিচিত এর গড় ঘনত্ব প্রায় 400ppm (ppm হল প্রতি 10 লাখে কত কণা)। গত এপ্রিল মাসে বায়ুমণ্ডলে এর গড় ঘনত্ব 410ppm এ পৌঁছেছে। বর্তমানে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এর ঘনত্ব গত আট লাখ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। এর জন্য দায়ী মানব সমাজের সাম্প্রতিক পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যকলাপ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ের মৌনা লোয়া অবজারভেটরি থেকে প্রতিদিনই বাতাসের কার্বনের পরিমাণ পরিমাপ করা হয়। সেখানে সংরক্ষিত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এ উপাত্ত পাওয়া গেছে। এর আগে বিশ্বের ৫১টি দেশ থেকে সংগ্রহ করা উপাত্তের ভিত্তিতে গ্রিনহাউজ গ্যাস বিষয়ক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে WMO। বাতাসে CO2 গ্যাস বৃদ্ধির কারণে গ্রিন-হাউজ ইফেক্ট (এ নিয়ে অন্য লিখায় বিস্তারিত বলব) বাড়ছে। যতই দিন যাচ্ছে ততই গ্রিন-হাউজ ইফেক্টের তীব্রতাও বেড়ে যাচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভিতরে CO2 এর আটকে পড়া। এভাবে চলতে থাকলে এই পৃথিবী থেকে এক সময় সভ্যতার চিহ্ন মুছে যাবে। গ্রিন-হাউজ ইফেক্ট কমানোর জন্য (Specially Carbon Di-oxide) ইউরোপিয়ান বিজ্ঞানীরা অভিনব এক পদ্ধতির আবিষ্কার করেছেন, সেটি হচ্ছে কার্বন মজুদ করা (Carbon Store)। এই পদ্ধতিতে মাটির নিচে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসকে মজুদ (Store) করে রাখা যাবে। ফলে এই গ্যাস আর পরিবেশে বের হতে পারবে না। মজুদকৃত এই গ্যাসকে পরে মানব সমাজের জন্য বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যাবে। এই গ্যাসকে কীভাবে পরিবেশবান্ধব উপায়ে ব্যবহার করা যায় সেটা নিয়েও এখন নানা গবেষণা চলছে।
কার্বন মজুদের মূল ধারণাটি হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যেটার মাধ্যমে কলকারখানা এবং বিভিন্ন পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে যে পরিমাণ কার্বন তৈরি হয় সেগুলোর কমপক্ষে ৯০ শতাংশকে বন্দী করে মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে। এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত হচ্ছে কার্বনকে সংগ্রহ করা, সেগুলোকে উপযুক্ত জায়গায় নিয়ে যাওয়া এবং এরপর সেটাকে পুঁতে ফেলার ব্যবস্থা করা। এই প্রক্রিয়া স্থাপন করলে কার্বন পরিবেশের উপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না এবং জলবায়ুর প্রতিকূলতা থেকেও দূরে থাকা যাবে। এখানে উল্লেখ্য যে, কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসকে একবার সংগ্রহ করে ফেলার পরই এটাকে তরলে পরিণত করতে হবে। এরপর এই তরলকে কয়েকশো মাইল দূরবর্তী নিরিবিলি জায়গাতে নিয়ে যেতে হবে এবং সেখানে মাটির নিচে মজুদ করতে হবে। তাই এই মজুদকরণের জন্য উপযুক্ত জায়গার প্রয়োজন (পৃথিবীর অনেক দেশের এ ধরনের জায়গা নেই তবে Mutual Win-Win Policy’র মাধ্যমে করা যাবে)। এছাড়া এ গ্যাস মজুদের জন্য সাধারণত ব্যবহার করা হয় না এমন কোনো গভীর স্যালাইন একুইফার (Deep Saline Aquifer) কিংবা কোনো তেলের খনি এমন সব জায়গা নির্বাচন করা যেতে পারে। তেলের খনিগুলোতে কার্বন গ্যাস পুঁতে রাখার জন্য Enhanced Oil Recover প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করতে হবে। (Source: Roar Bangla)। একদিক দিয়ে কার্বনকে মাটির নিচে পাঠিয়ে দেয়া হবে, আবার অপর দিকে সেখান থেকে তেল উপরে টেনে তোলা হবে। এতে তেল খনি থেকে আলাদাভাবে উঠানোর খরচও বেঁচে যাবে। তবে এই প্রকল্প কিন্তু অনেক খরচের ব্যাপার। তরল কার্বনকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্যই অনেক খরচ হবে। ব্রিটেনে এই কার্বন স্থানান্তরণের জন্য কেমন খরচ পড়তে পারে সেটার একটা হিসাব করা হয়েছে। তরল কার্বনকে যদি পাইপ দিয়ে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় তাহলে প্রতি মাইলে 1 মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় 10 কোটি টাকা) খরচ পড়বে (Source: UK Environment Department, 2017)।
প্যারিসে জলবায়ুর যে চুক্তি (COP-21) সই হয়েছিলো সেটা বাস্তবায়ন করতে হলে কার্বন মজুদের দিকে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে (বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোকে এগিয়ে আসতে হবেই)। IPCC থেকে সম্প্রতি কিছু গবেষণাপত্র বের হয়েছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে একমাত্র কার্বন মজুদকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আগামী 100 বছরে পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের ভিতর রাখা সম্ভব। যেহেতু কার্বন মজুদকরণ প্রকল্প একটি মেগা এবং অত্যন্ত খরচ সাপেক্ষ একটি প্রকল্প, তাই এর আয় এবং ব্যয়ের হিসাবের দিকে একটু চোখ বোলানো যাক। গণনা করে দেখা গিয়েছে যে, যে বাজেট পাস হয়েছে এর মধ্যে কাজ করতে হলে প্রতি মেট্রিক টন কার্বনকে মাটিতে পুঁতে ফেলতে খরচ হবে 50 ডলার এবং 35 ডলার করে খরচ হবে অন্যান্য কাজে। এর মধ্যে কোল বা কার্বন জাতীয় প্ল্যান্টগুলো থেকে নিয়ে আসা কার্বনের ক্ষেত্রে খরচ পড়বে 60 ডলার এবং প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপন্ন করা প্ল্যান্টগুলো থেকে নিয়ে আসা কার্বনের জন্য খরচ পড়বে 70 ডলার। তাছাড়া প্রতি মেট্রিক টনে 11 ডলার করে খরচ পড়বে কার্বন স্থানান্তরণের জন্য।
এমতাবস্থায়, মানবকল্যাণে এমন একটি Environment Friendly প্রযুক্তি দাঁড় করানো অতীব প্রয়োজন। Comparative Economic Investment Cost and Environmental Return বিবেচনায় এ প্রযুক্তিটি মোটেও খরচ সাপেক্ষ নয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন এ হারে পরিবেশে কার্বন (CO2) বাড়তে থাকলে Global Warming দ্রুততর হবে, মেরুর অবশিষ্ট বরফ গলে যাবে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাবে। এছাড়া প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে, যার লক্ষণ ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। তাই এই পৃথিবী টিকিয়ে রাখতে হলে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা অবশ্যই কমিয়ে আনতে হবে এবং Carbon Store Project হাতে নিতে হবে।
